Literary Pursuit (Short Story in Bengali)

দিনলিপি

প্রমিতা বসু

মই বেয়ে বাসের ছাদে উঠে ভাজা খই খেতে খেতে সক্কাল-সক্কাল গ্রাম থেকে শহর অভিমুখে রওনা হলেন পঞ্চাশোর্ধ কানাই দলুই I পরনে ফিকে হয়ে যাওয়া হলুদ ফতুয়া আর রিপু করা চেক নীল-সবুজ লুঙ্গি I দু পায়ে এক জোড়া সাধারণ মানের সেলাই করা চপ্পল I কেবল এ টুকুই সম্বল করে প্রতি বুধবার এই একই নিয়ম পালন করে চলেন মাঝবয়সী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী — মুন্সিপাড়ার দলুইদা I এর অন্যথা কখনো হয়না I শুকনো মুখ, উস্কোখুস্কো চুল আর দুগালে ও থুতনিতে কাঁচা-পাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে তার শীর্ণ দেহে দূরপাল্লার এক বিশালাকায় চার চাকার গাড়ির মাথায় চড়ে বসলেন প্রৌঢ় । করজোড়ে কপালে নমস্কার ঠুকে দুগ্গা দুগ্গা বলে যাত্রা করলেন শান্ত মনের নির্লিপ্ত স্বভাবের পরিশ্রমী মানুষটি I

উদয়-অস্ত কাজ করে চলেছেন মিতভাষী লোকটি I মুখে কোনো রা নেই I কপালে হালকা বলিরেখা দেখা দিয়েছে I কিন্তু তাতে কি? সময় কি আর কারোর জন্য থেমে থাকে বুঝি! প্রান্তিক সমাজের একজন হয়েও জীবনের প্রতি তার এতটুকু আক্ষেপ নেই I তিনি দিব্বি আছেন নিজের চরখায তেল দিয়ে I সাতে পাঁচে না থেকে I আগে পিছে কিছু না ভেবে I এমনকি ভগবানের দরবারেও অনুযোগ পূর্ণ কোনো নালিশ তার তরফ থেকে এখনো আসেনি I প্রতিবাদের চিরকুট এখনো জমা পড়েনি তার রোজনামচার পাতা থেকে I

মাথার সাদা-কালোয় মেশানো চুল ক্রমশ পাতলা হয়ে গিয়ে অল্পস্বল্প টাক দেখা দিয়েছে I কয়েকাংশে তা চকচক করে উঁকি মারছে রৌদ্রছায়ার অবিরাম লুকোচুরি খেলার মতো। চোখে শ্রান্ত ঘোলাটে দৃষ্টি I শ্রমের বিকল্প হয় না ঠিকই আবার কষ্টও তো কম নয়, তিনি তা বিলক্ষণ জানেন । কিন্তু কি আর করা যায়? তিনি যে নিরুপায় I চিন্তা করে তো কোন লাভ নেই I জীবন যুদ্ধে তার দৈনন্দিন ওঠা পড়ার অনুশীলন যেন অভ্যেসে এসে দাঁড়িয়েছে I সুরাহা বলতে কেবল এই অপরিসীম সংগ্রাম, যা তাকে বন্ধুর পথেও মসৃন ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে I

ভ্যান রিকশায় চেপে ধান ক্ষেতের আল ঘেঁষে মেঠো পথ পেরিয়ে বাস ধরতে আসেন খাটো চেহারার এই খেটে খাওয়া মানুষটি। I সঙ্গে নিয়ে আসেন দশ কিলো চাল, সাত কিলো ডাল আর কুড়ি কিলো আলুর বস্তা, যা অতি সস্তায় তিনি আঞ্চলিক মঙ্গল হাট থেকে প্রত্যেক সপ্তাহে কিনে আনেন I বাসের খালাসির সাহায্যে সেই ভারী মাল গুলো কানাই তার নগরভ্রমণের আগে ও পরে বাসের মাথা থেকে প্রতিবার ওঠানো-নামানো করেন I

মহানগরের বড়বাজারে বেশ চড়া দামে তার বয়ে আনা পণ্যসামগ্রী বিক্রি করেন I গাঁয়ের পড়শী মদন সাঁপুইয়ের মানসী ভান্ডার মুদির দোকানের ছোট পরিসরে বসে কানাই তার পসরা সাজান এবং নিশ্চিন্তে ঝুড়ির সারি থেকে বিকি-কিনি চালান I বাকি পড়ে থাকা মাল গুদামে মজুত রাখেন I আগামী দিনগুলির জন্য I সংসারে তো রসদের যোগান দিয়েই যেতে হবে, নাকি?

মদনের দয়ার শরীর I সে কানাইকে নিজের বড়দাদার মতোই সমীহ করে I বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে দুই পরিবারের মধ্যে গভীর সম্প্রীতি ও নিত্য আনাগোনা বজায় আছে I তাই কানাইয়ের আর্থিক অনটনের কথা জেনে তার কাকুতি-মিনতি ফেলতে পারেনি মদন I মদনের বহু পুরোনো বিশ্বস্ত ভৃত্য বসন্ত গিয়ে কানাইয়ের তল্পি-তল্পা বাস স্ট্যান্ড থেকে ঠেলায় করে নিয়ে আসে তার মনিবের দোকানের চৌকাঠ পর্যন্ত I কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কানাইও তার লাভের আয়ের বেশ কিছুটা অংশ মদনকে প্রতি মাসে মনে করে দিয়ে দেন I প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক মুনাফা না হলেও হপ্তান্তর শহরের জল হাওয়া গায়ে লাগাতে তার একবার আসা চাই চাই I বাসে, ট্রামে বা দামি গাড়িতে চড়ে আপিসে-যাওয়া বাবুদের হাল-হাকীকত, বাজার-দর, রাজনৈতিক তরজা, সরকারি খবরাখবর — এ সবই তার উৎসুক মনকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে I

পরে বেলা বাড়লে পুস্তক পাড়ায় গিয়ে তার এক মাত্র ছোট্ট মেয়ে পুঁটির জন্য ছড়ার চটি বই কেনেন কানাই I নামজাদা মিষ্টির দোকান থেকে বৌয়ের ফরমায়িশ মাফিক কড়া পাকের সন্দেশ আর নলেন গুড়ের দই নেন I মাছের বাজার থেকেও মনে করে তাকে আনতে হয় বৈকি — কই ও রুই আর শাক-সব্জির সারি থেকে দুই আঁটি পুঁই I ঘিঞ্জি গলির এক কোন ঘেঁষে একটি বৃদ্ধ বৈদ্যের অপ্রশস্ত বৈঠকখানা থেকে আয়ুর্বেদিক বড়ি নিতে একেবারেই ভোলেননা বাতের ব্যাথায় কিঞ্চিৎ কাতর কানাইরাম I আর ময়দানের কাছে একটি নীম গাছ লাগোয়া ছৈ সমাদ্দারের ছোট বাক্সাকৃতি দোকান থেকে এক খিলি মশলা পান কিনে মুখে পুড়ে ট্রাম লাইনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আয়েশ করে পান চিবোতে বড়ই ভালোবাসেন নিপাট এই ভালোমানুষটি I

“যাক বাবা! শীতের আমেজটাই আলাদা,” মনে মনে ভাবলেন খোশমেজাজী কানাই I নরম আলোর গরম গায়ে মাখলে বেশ আরাম দেয় I বর্ষায় চারিদিক জল থৈ থৈ করে বলে শহরের রাস্তায় তখন ঠিকমতো যাতায়াত করা ভীষণই অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে I অযথা হয় সময় নষ্ট I যদিও গিন্নি পই পই করে বলে দিয়েছিলেন, “বাসের ওপর চেপে বসে বেশি ঠান্ডা হাওয়া লাগিওনা লক্ষীটি I” কিন্তু নিরুপায় এই ‘দিন আনে দিন খায়’ মানুষটি I দু পয়সা বাঁচিয়ে বাসের সিটের টিকিট না কেটে কিছু খুচরো মূল্যের বিনিময়ে তার চালে বসে যাতায়াত করাটাই শ্রেয় বলে মনে করেন মিতব্বাই কানাই I উলের গরম জামাকাপড় বলতে গায়ে একটা ছেঁড়া হাত কাটা বেগুনী সোয়েটার কোনোরকমে গলাতে হবে আর তার ওপর নস্যি রঙের চাদর চড়াতে হবে যাতে গুটি কয়েক ছিদ্র বেশ পরিষ্কার ভাবে নজর কাড়বে I

কানাই এক মনে ভাবতে লাগলেন তার এই সাদামাটা জীবন থেকে তিনি কি পেলেন আর খোয়ালেন I কয়েক মুহূর্ত পর তার অন্যমনস্কতার ঘোর কাটলো। তিনি আবার সম্বিৎ ফিরে পেলেন। ছায়াছবি প্রেখ্যাগৃহের দেয়ালে তাবড় তাবড় তারকাদের পোস্টার আর অতিকায় কাট-আউট দেখে কানাইয়ের চোখে তাক লেগে গেল I হৈ হৈ করে চমকপ্রদ হিন্দি সিনেমা চলছে সেখানে I মিছিল মিটিংয়ের ব্যস্ত গুমোট নগরীতে একদমই তিল ধারনের ঠাঁই নেই I প্ল্যাকার্ড, দেয়াল-লিখন, ধর্ণা আর স্লোগানে-স্লোগানে ছয়লাপ রাস্তাগুলি I যত্র তত্র যানজট I তার গিট্ ছাড়াতে হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে, ঘন্টার পর ঘন্টা I এসব দেখে সিধে সরল মানুষদের মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় আর কি! তবুও কানাই এই সব কিছুই অবাক বিষ্ফারিত নেত্রে দেখতে থাকেন I স্পঞ্জ এর মতো শুষে নেন সবটা। প্রতিদিনের এই পথনাটিকা তাকে যেন নেশা ধরিয়ে দেয়!

হঠাৎ তার মনে পড়ে যায় চৈ সামন্তের সেই পুরোনো চায়ের দোকানের কথা I তিনি ভাবেন এক ভাঁড় লাল চায়ের সাথে দুটো লেড়ো বিস্কুট আর একটা কাগজের প্লেটে কিশমিশ যুক্ত টিফিন কেক খাওয়ার মজাটাই যেন আলাদা I চেনা-অচেনা চেহারার ভীড়ে হৈ চৈ করে আড্ডা দিতে দিতে তার সময় কোথা দিয়ে যে কেটে যায় তিনি ঠাওর করতে পারেননা I দূরে গগনচুম্বী বহুতল বাড়ির ওপর দিয়ে কুসুম রঙা সূর্যকে ডুবতে দেখা যায়। কংক্রিটের জঙ্গলে রোদ ঝলমলে দিনের শেষে এক ফালি সবুজ-প্রকৃতিকে বারান্দা দিয়ে ঝুলতে দেখা যায় I লতায় পাতায় ফুলে মোড়ানো সুন্দর গাছ লাগানো টবের সারিতে I শোভা পায় হরেক রঙের ছটা I ভেতরে ভেতরে যেন এইসব পায়ড়ার কোটরের মতো ঘরগুলিতে একরাশ অন্ধকারের মতো অভিমান জমে আছে I অথবা ছোট ছোট খুশি...কে বলতে পারে? সেটাই বা কম কি? ঠিক যেন সব হারানোর মাঝে নিজেকে আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়ার হাতছানির লোভ গ্রাস করে। বুক ভরা প্রশ্বাস নিয়ে আরো একবার বেঁচে থাকার সুযোগ মুঠোবন্দি করতে চায় পারমাণবিক পরিবারের বাসিন্দারা I তাদের রঙিন কাল্পনিক পাখনাগুলি মেলে ধরে I যদি কখনো আকাশে উড়তে ইচ্ছে হয়!

রেল স্টেশন নিকটবর্তী ফুলের মার্কেট থেকে তার আহলাদীনি স্ত্রী চামেলীর জন্য সাদা জুইয়ের মালা নেবেন কানাই । সে যে সই পাতিয়েছে তার প্রতিবেশী গৃহবধূ শৈলর সাথে পুকুরপাড়ে রক্তজবা সেজে। সে তার সখি জুঁই ফুলকে মালা উপহার দিয়ে তাদের সখ্যতা পাকাপাকি ভাবে মজবুত করবে বলে কথা দিয়েছে। কানাইয়ের হঠাৎ যেন মনে হলো যে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে স্বপ্নের জাল দিয়ে ঘেরা সোহাগময় স্বর্গসুখের প্রাসাদে সবাই নিজেকে ভাবে, “আমি হই রাজা, আমি নই গো প্রজা।” কিন্তু কল্পনার এই বেড়াজাল টপকে মানুষ যখনি বাস্তবের আস্তাখুড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে, তখনি মনের মানুষটি কে চোখের জলে আকুতি জানিয়ে বলে: “আমি লৈ যত আছে সব দুঃখ, জ্বালা ও বেদনা, তোমার জন্য রইলো কেবল হাসি-আনন্দে মোড়া গহনা ।”

সন্ধে নামছে সবে, এবার বাড়ি ফেরার পালা। বাতাসে কিছুটা হলেও মৃদু শীতল হাওয়া বইতে শুরু করেছে যা গ্রামের দিকে এগোলে আরো বেশি করে হাড়ে কাঁপুনি ধরাবে। তাপ্পি মারা থলির ভেতর থেকে টাকা-পয়সার পোটলাটা সরিয়ে একটা ছাই রঙা হাতে বোনা মাফলার বার করে গলা আর কানের পাশ দিয়ে জড়িয়ে নেন কানাই। নির্ঝর গাঁয়ে গৈ পাড়ুইদের মাঠে আজ রাতে বসবে কীর্তন মেলা। ভক্তদের সমাগমে চারিদিক গমগম করবে। বাতাসে সংগীতের সুর দূর থেকে ভেসে আসবে। মন ভরে যাবে পবিত্র ভক্তিরসে ও প্রশান্তিতে । তিলক কাটা বোষ্টম-বোষ্টমীদের গান ও শিল্পবোধ আসর মাত করবে। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর অমূল্য বাণী ও মাহাত্ম আবারো ছড়িয়ে পড়বে।

নিঝুম অন্ধকারে আর একটু বাদেই এক ঝাঁক পাখির দল বাসা মুখী হবে। কাঁচা রাস্তায় বাস থামতে দেখলেই কিচিরমিচির কাকলিতে একত্রে বলে উঠবে, “ওই দেখো, কি সুন্দর পূর্ণিমার সাদা গোলাকার চাঁদ উঠেছে হাসি-হাসি মুখ নিয়ে মাঝ আকাশে । এবার তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরো গো কর্তা। আবার খুব শিগগির দেখা হবে আমাদের I এই পথ দিয়েই যেতে যেতে । যেদিন তুমি ফিরবে শহরে!” তাদের সমবেত কণ্ঠ কানাইয়ের কানে শানাইয়ের একটানা সুরের মতো বাজতে থাকবে, অহরহ।

***************************************************************************************************

Comments

Popular posts from this blog

Wellness Wows (Dry Brushing)

Health Watch (Monkeypox/Mpox)

Wellness Wows (Malta Oranges)