Literary Pursuit (Short Story in Bengali)
ক্রব্যূহে চিতা
প্রমিতা বসু
তার
পায়ের চাপে
শুকনো পাতায়
খসখস আওয়াজ
হলো। পাশাপাশি
ঝোড়ো হওয়ার
ঝাপ্টায় গাছের
ডালগুলি দুলেদুলে
মর্মর শব্দ
করতে লাগল।
আর তাতেই
তার বুক
অল্পস্বল্প ঢিপঢিপ
করে উঠলো।
যদিও লোকমুখে
তার বাহাদুরির
যথেষ্ট সুনাম
আছে। তবুও
নির্জন পথ
দিয়ে একলা যেতে
যেতে কার
না ভয়
লাগে। অতি
বড় সাহসী
ডানপিটে মানুষেরও
হাত পা
কেঁপে ঠান্ডা
হয়ে যায়।
তাই দুরুদুরু
চিত্তেই তিনি
একা একা
চলতে থাকলেন।
সময়টা ১৯৪০ দশকের মাঝামাঝি। উত্তর বঙ্গের ডুয়ার্সের নাংডালা চা বাগান তখন বিকেলের হিমেল হাওয়ার চাদর মুড়ি দিয়ে কিছুটা জড়সড়। তার পার্শবর্তী খয়ের গাছের নিস্তব্ধ বন আপন মনে শুধু বাতাসের ক্রমাগত শোঁ শোঁ শিস শুনে চলেছে। তারই মাঝখান দিয়ে কিছুটা হেঁটে, কিছুটা সাইকেল চড়ে মধ্যবয়সী হেমেন্দ্রচন্দ্র দত্ত চুপ চাপ এগিয়ে যাচ্ছেন নিজের গন্তব্য স্থলের দিকে।
যেখানে
ভূমি কিছুটা
সমতল সেখান
দিয়ে সাইকেলে
চেপে খানিকটা দূরত্ব
কমিয়ে নিচ্ছেন
চালক সাহেব।
সাইকেল এর
চেনের একটানা
কড়কড় সুর
আর বড়
বড় টায়ারের
ক্রমাগত মাটির
ওপর দিয়ে
দাগ কেটে
চলা যেন
একটা রোমাঞ্চকর
ছবি এঁকে
চলেছে। পরিবেশটা
থমথমে। পথ
যেখানে আবার
বন্ধুর ও
রুক্ষ, সেখান
দিয়ে হেঁটে
যাওয়াটাই উচিত
বলে মনে
হলো নিসঃঙ্গ
যাত্রীর। মিশমিশে
কালো রঙের ডালপালায়
চারিদিক প্রায়
অন্ধকারাচ্ছন্ন।
গায়ে যেন
কাটা দেয়।
কাছাকাছি যদিও
একটি জনবসতি
আছে কিন্তু
সেটাও তো
সংখ্যায় হাতে
গোনা।
প্রধানত মাধেশী কুলিদের লোকালয়। তাদের বাঁশের ব্যাড়া দিয়ে ঘেরা মাটির ঘরবাড়ি ও দালান, খড়ের ছাউনি, কাঁচা রাস্তা এবং দোকানপাঠ ছড়িয়ে ছিটিয়ে roeছে। নাংডালা টি এস্টেটের ম্যানেজার স্বয়ং শ্রীমান হেমেন্দ্রচন্দ্র দত্ত। সবার কাছে যিনি রাশভারী অথচ জনদরদী হেমবাবু বলে সুপরিচিত। চা বাগানের শ্রমিক বংশীর নাকি হঠাৎ ভীষণ বড় অসুখ করেছে। সেই কথা শোনামাত্র তিনি হন্তদন্ত হয়ে কারোর বারণ না শুনেই সন্ধের মুখে রোগীর খোঁজ খবর নিতে বেড়িয়ে পড়েছেন।
দিনটা ছিল রবিবার। সপ্তাহান্তে ছুটির দিন। গৃহস্থালির কাজকর্ম সেরে ভাত ঘুম দিয়ে দরজায় খিল আটকে ঘরের ভেতর গুটিশুটি হয়ে থাকার দিন। হেমবাবু তার স্ত্রী সুখলতার হাজার উপরোধ ও নিষেদ সত্ত্বেও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন। যেমনটা তিনি সর্বদা করে থাকেন। বলাই বাহুল্য যে পড়ন্ত সূর্যের নরম রোদ গায়ে মেখে সাইকেল নিয়ে তিনি জঙ্গল অভিমুখ হলেন। ছোট্ট ছোট্ট দুটি ছেলে মেয়ে চিনু-কানুর কাকতি মিনতিও তার কানকে কাবু করতে পারলোনা। আদুরে মেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল ঠিকই তবুও তিনি তাকে খুব শিগগিরই ফিরবেন বলে কথা দিয়ে রওনা হলেন।
পায়ে তার বুটজুতো মোজা, পরনে ফুল প্যান্ট, গুজে পড়া আঁটোসাটো গরম ফুল হাতা শার্ট ও মাথায় কান ঢাকা মাফলারের ওপর টুপি। বাগান আর অরণ্যে ঘেরা প্রকৃতির কোলে মাঝ হেমন্তকালেই আসন্ন শীতের বার্তা ভেসে আসে। শরীরের ভেতর শিরশিরানি ভাব জেগে ওঠে। একথা সেকথা ভাবতে ভাবতে হেমবাবু কিছুটা হলেও অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ সামনে দিয়ে গায়ে কালো ছোপ ছোপ দেওয়া হলুদ জামা চড়িয়ে কোন একটি জংলী চতুষ্পদ কে বা দিকের গাছের সারির আড়াল থেকে বেড়িয়ে ডান দিকে চলে যেতে দেখলেন। তার চিন্তার মালা গাথায় অযাচিত ছেদ পড়ে গেল। যেন এক গুচ্ছ সাজানো পুঁথি খসে নিচে পড়লো। হতভম্ব হয়ে তিনি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন এবং সাইকেল সমেত নিপতিত হলেন। মাথার টুপিটা খানিক দূরে ছিটকে গেলো আর হাত ঘড়িটা কব্জি থেকে খুলে এসে ঝুলতে লাগল।
মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় তিনি বিস্মিত, স্তম্ভিত দৃষ্টিতে দেখতে পেলেন যে প্রায় দশ ফুট দূরে একটি চিতা বাঘ বিষ্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। হেমবাবুর সারা শরীরে তখন শিহরণ জেগে উঠেছে। দেহ ধীরে ধীরে যেন অসাড় হয়ে আসছ। অদ্ভুত ভাবে তার সাইকেলটি কাত হয়ে গিয়ে যেন এক পায়ে দাড়িয়ে গিয়েছে। প্যাডেল আর চেনের সাথে পিছনের প্রকান্ড চাকাটি আকাশের দিকে মুখ তুলে চেয়ে আছে। আর আশ্চর্য ব্যাপার হলো সেটা এক নাগাড়ে ঘুরে চলেছে। কেবল অবিরাম একটা মৃদু মন্দ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সাইকেলের হেডলাইটটাও অন্ধকার ভেদ করে তখন দীপ্তিমান। তার উজ্জ্বল রশ্মির ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার জোগাড়। দিনের আলো পুরোপুরি নিভে আসার আগে তার এক ফালি আগুনরঙা আভা ভাসমান মেঘের পাশে দিব্বি একটা হালকা হাসির রেখার মতো লেগে রয়েছে। হেমবাবুকে ইতিমধ্যে একদম কিংকর্তাব্যবিমূড় ও নিশ্চল দেখাচ্ছে। তবু তারই মধ্যে একটু সাহস সঞ্চয় করে তিনি মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পেলেন বুনো জন্তুটির স্থির জ্বলজ্বলে দুটি চোখ ও তার থমকে যাওয়া পদক্ষেপ।
হেমবাবু সেদিকে ভালো করে লক্ষ্য করে দেখেন যে বাঘের দৃষ্টি এক জায়গায় এসে নিবদ্ধ হয়েছে। আর সেটা হলো ওই ঘূর্ণায়মান চাকা আর সাইকেলের ভাস্বর বাতি। ব্যাঘ্রমশাই সম্পূর্ণ রূপে সম্মোহিত ও ঈষৎ আতঙ্কিত। এই দৃশ্য যেন অলৌকিক, অপার্থিব। একেবারে চমকে দেওয়ার মতো। ক্যামেরায় আজীবন বন্দি করে রাখা যায়। এমন সময় হেমবাবুর মাথায় বিদ্যুতের গতিতে একটা বুদ্ধির ঝিলিক খেলে গেল। তিনি মনে মনে ভাবলেন এই তো সুযোগ। যদি কোন ভাবে পিছন দিকে তার শরীরটাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ঢালু জমি দিয়ে নিচে নেমে একটা লম্বা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা খয়ের গাছ অবধি পৌঁছনো যায় তাহলে তিনি প্রাণে বাঁচলেও বাঁচতে পারেন। অন্তত একটা উপায় খুঁজে বার করার ফন্দি আঁটতে পারেন। হাতে মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত বাকি। তার মধ্যেই তাকে যা করার করতে হবে।
চাকার দুরন্ত ঘূর্ণি দেখে বাঘমামা যেন বেজায় ভেবাচেকা খেয়ে একটা নিথর মূর্তি হয়ে দাড়িয়ে পড়েছেন। হেমবাবু হতবাক হয়ে ভাবলেন যে “চিতার চেতনা কি একেবারে লোপ পেয়ে গেল নাকি!” তিনি চিরদিনের জন্য একটি অবিশাস্য দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইলেন! কতবার যে সেদিন তার সাইকেলের চাকা চড়কি বাজির মতো ঘুরপাক খেয়েছিল তা একমাত্র ভগবানই জানেন। চাকার ঘূর্ণাবর্ত দেখে হেমবাবুরই মাথা যেন একবারের জন্য হলেও, বন বন করে ঘুরে উঠলো। চক্ষু চড়ক গাছ হওয়ার অবস্থা আর কি। সেই মুহূর্তে কেবল ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ মন্ত্রই তিনি মনে মনে জপ করতে লাগলেন।
প্রাক শীত মরশুমেও যেন তার দেহ দিয়ে ঘাম ঝড়ার উপক্রম হলো। অতিকষ্টে তিনি নড়ার চেষ্টা করলেন। বাঘের ওপর থেকে দৃষ্টি এবং মনোসংযোগ কোনটাই বিন্দুমাত্র সরালেন না। চিৎ হয়ে শোয়া অবস্থা থেকে উবু হয়ে হামাগুড়ি দিতে চেষ্টা করলেন। কয়েক মিটার দূরের ঢেউ খেলানো জমিটা পেয়ে গেলেই ব্যাস নিচের দিকে নামতে শুরু করবেন। আর তাতেই হয়তো বাঘের দৃষ্টির নাগালের বাইরেও যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে। এই ভেবে তিনি আড়াআড়ি সরতে শুরু করলেন। আধ ইঞ্চিকরে সম্মুক গতিতে সরতে সরতে মনে হলো এক বছর কেটে যাবে। তবুও হাল ছাড়লেন না। কচ্ছপ নীতি অবলম্বন করলেন। ধীর পায়ে অবিচল উদ্দেশে এগিয়ে গেলেন। এই স্নায়ুযুদ্ধে যে তাকে জিততেই হবে।
কথায় বলে ‘রাখে হরি মারে কে’। যেদিকে মাটি একটু অধোগামী সেদিকে পৌঁছে তিনি উঠে দাঁড়াবার প্রয়াস করলেন। পা তার ধরে এসেছিল ঠিকই তবুও তিনি প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে গেলেন। মৃত্যু যখন হাতছানি দিয়ে জীবনের দোরগোড়ায় এসে ডাকতে থাকে তখন একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতে হয় বৈকি। তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। একবার দাঁড়িয়ে মনে হলো তিনি আবার ভিরমি খেয়ে পড়ে যাবেন। দুটি হাতের চেটো ও চোয়াল শক্ত করে মাটির ওপর ভর করে হেমবাবু অবশেষে উঠে দাঁড়ালেন। কয়েক পা দূরে একটা খয়ের গাছ দেখতে পেলেন। সেদিকে হিম্মত করে এগিয়ে যেতে লাগলেন। এক একটা ক্ষণ যেন দৈর্ঘে এক একটা ঘন্টার সমান মনে হতে লাগল তার। তাও তিনি চলতে থাকলেন।
একটি গাছের গুড়ি অবধি পৌঁছে মাথা উঁচিয়ে কোনরকমে দেখতে পেলেন যে বাঘ এখনো দন্ডায়মান। আর তার সাইকেলের চাকাও অনবরত ঘুরে চলেছে। হেডলাইটের আলোর বিচ্ছুরণ চারিদিকে একটা মনোরম মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আর সেই মায়াজালের ফাঁদে বাঘ মশাই পা দিয়েছেন দীর্ঘসময় ধরে। কে জানে বাঘ মামা হয়তো সেদিন অন্য কোন এক আজব ভয়ঙ্কর জীবকে ওই হেডলাইটের ফোকাসের ভেতর আবিষ্কার করেছিলেন। হেমবাবু তখন ও বিপদমুক্ত নন কারণ বাঘের ত্রিসীমানার বাইরে তিনি পালাতে পারলেননা। তবে কপালজোরে তিনি দরাজ গলার অধিকারী এবং সেটাই কাজে লাগানো শ্রেয় মনে করলেন।
একটি গাছের ডাল বেয়ে কিছুটা চড়ার চেষ্টা করলেন। কয়েক ধাপ ওপরে উঠে পাতার ফাঁক দিয়ে মুখ বার করে উচ্ছস্বরে চিৎকার করতে লাগলেন: “বাঁচাও! কে কোথায় আছো আমাকে বাঁচাও। আমি বাঘের কবলে পড়েছি। আমায় উদ্ধার করো!” শব্দের মাপযন্ত্র থাকলে তিনি কোন ডেসিবেলে সেদিন সন্ধেবেলায় জঙ্গলের ভেতর চেঁচিয়েছিলেন তা নিশ্চিত ঠাহর করা যেত। একেবারে সেই প্রত্যন্ত গ্রামের রাত জাগা প্রহরীর ‘জাগো হুশিয়ার’ ডাকের চেয়েও অট্ট আর্তনাদ। নিঝুম অরণ্যের আঁধার চিরে যেন সেই চিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো পরমুহূর্তেই আবার শুকনো পাতার ফরাসে খসখস শব্দ শোনা গেল। কয়েকজন মানুষের হাঁটাচলার ও ব্যস্ত পায়ের আওয়াজ। রঘুপতি ডাক্তার ও সঙ্গে দু-চারজন কুলি হাতে মশাল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে এগিয়ে আসছে। ডাক্তারবাবুর হাতে টিমটিম করছে একটা টর্চের আলো। ওই পথ দিয়েই তারা যাচ্ছিলেন। হেমবাবুর উদাত্ত কণ্ঠস্বর পেয়ে সেদিকে তড়িঘড়ি ছুটে গিয়ে দেখেন ম্যানেজার বাবু গাছে উঠে বসে আছেন।
“একি হেমবাবু, আপনি এখানে কি করছেন? আর গাছে চড়েছেন কেন?” অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ডাক্তারবাবু। তার কথা শুনে যেন ধরে প্রাণ এল হেমেন্দ্রচন্দ্র দত্তের। আর থাকতে না পেরে তাড়াহুড়ো করে গাছ থেকে নামতে গিয়ে তার প্রায় পা হড়কে যেতে বসলো। “আরে আরে করেন কি! আসতে আসতে,” বললেন এলোপ্যাথি চিকিৎসক ডাঃ রঘুপতি সান্যাল। কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে হেমবাবু আঙুল দিয়ে কোনাকুনি ডানদিকে দেখিয়ে অস্ফূটে বললেন “বা-বব-আ-আ-ঘ-ঘ!”। ততক্ষনে চিতা বাঘটির সম্বিৎ ফিরে এসেছে। হুশ পেয়েই সে দ্রুতবেগে দিলো এক ছুট ঘন জঙ্গলের দিকে। মানুষের ভীড় ও চোখ ঝলসানো মশাল দেখে সে ভয়ে পালানোর চেষ্টা করলো।
“বলেন কি! একি সব্বোনাশ। এই তোরা একবার গিয়ে দেখ তো কোন দিকে চিতাটা পালালো,” তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা কুলিদের নির্দেশ দিলেন ডাক্তারবাবু। বলামাত্র একটি সর্দার গোছের কুলি সবাইকে একজোট হয়ে বাঘের পিছনে ধাওয়া করতে বলল। “এ লেদ্রু, ফেকু, এতোয়া, বায়দা, শুকরা, সোমরা, মংড়া, আবে! সব বাঘ কে পিছে জলদি কুদো।” সে জোর গলায় বলে উঠলো। নিমেষে ঢেঁড়া পিটিয়ে, আগুন জ্বালিয়ে বহু লোকের সমাগমে চারিদিক গমগম করতে লাগল। সবাই মিলে বাঘ যেদিকে দৌড়েছে সেদিকে ছুটে গেল যাতে বাঘটিকে পুরোপুরি তার নিরাপদ বিচরণ ভূমির দিকে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া যায় এবং জনগণের বসতির থেকে আরো দূরে সরিয়ে রাখা যায়।
“আপনি এবেলা ফরেস্ট এরিয়া দিয়ে কোথায় যাচ্ছিলেন হেমবাবু?” প্রশ্ন করলেন ডাক্তারবাব। “বাগানের লেবার বংশী কে দেখতে। মানে তার খবর নিতে। শুনলাম সে নাকি খুব অসুস্থ,” উত্তরে গম্ভীর ভাবে বললেন হেমবাবু। “কি মুশকিল। আমিও তো ওইদিকেই যাচ্ছিলুম। বংশী নাকি হাড়িয়া খেয়ে মাতাল হয়ে একটি জংলী হাতির সামনে পড়েছিল এবং তাকে গণেশ ঠাকুর ভেবে প্রণাম করতে গিয়ে তুমুল বিপাকে পড়ে। হাতিটা নাকি বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে সুরে পেঁচিয়ে পাশের ঝোপঝাড়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। প্রাণে বাঁচলেও তার সারা গা কাঁটা ঝোপে কেটেছড়ে গিয়েছে। প্রচুর রক্ত ঝরেছে। এখন নাকি তার ধুম জ্বর। দেখুন দিকিনি কি ঝামেলা! বেশি বাড়াবাড়ি হলে তো সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তা আপনি তো বংশীর খবর পেয়ে আমার কাছেই আসতে পারতেন। এক সঙ্গেই যাওয়া যেত। এরকম সন্ধের মুখে একা একা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাওয়া আপনার মোটেই উচিত হয়নি। কখন কোথায় সাপ-খোপ, বন্যপ্রাণী বেড়িয়ে পড়ে একটা বিপত্তি বাধায়, সেটা কি কারো আগে ভাগে জানা আছে? এরাই আমাকে খবর দিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে,” ডাক্তারবাবু তার পাশের দুটি কুলিকে দেখিয়ে বললেন।
হেমবাবু এবারে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। তার বুক ধড়পাড়ানি কমে গিয়ে এখন অনেকটাই স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল। ডাক্তার সান্যাল তার নাড়ি টিপে পরীক্ষা করে পাল্স রেট নর্মাল জানালেন। “আপনি আমাদের সাথে চলুন। ওখানে গিয়ে জলটল খেয়ে একটু জিরোবেন ক্ষণ। আর তো মাইল আধেক পথ বাকি। আমরা গ্রামের একটি নিকটবর্তী স্থানেই আছি,” ডাক্তারবাবু তার কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে জানালেন।
গাছের নিচেই হেমবাবু বসেছিলেন। উঠে দাড়াবার সময় খেয়াল করলেন যে হাত থেকে তার ঘড়ির চামড়ার স্ট্রাপটা ছিড়ে খসে পড়ে গেছে। ওপর থেকে নামবার সময় গাছের ছালে তার হাত পা কিছুটা আঁচড়ে গিয়েছিল। গায়ের কাপড়েও কোথাও কোথাও ফুটো দেখা দিয়েছে। রঘুপতি ডাক্তারের টর্চের আলোয় তিনি হাতঘড়িটা দেখতে পেয়েই মাটি থেকে সেটা তুলে নিয়ে তার প্যান্টের পকেটে সযত্নে পুড়ে নিলেন। ডাক্তারের সাহায্যে কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোতে গিয়ে অনতি দূরে পড়ে থাকা তার টুপিটাও দেখতে পেলেন।
স্বগতোক্তির মতো বলে ফেললেন, “আমার টুপি।” সঙ্গের বয়স্ক বিশ্বাসী কুলি বায়দা বলে উঠলো, “বড়াবাবু, হাম অভি ভাগকে লেই আতে হায়।” বলেই সে দৌড় দিয়ে তার খাটো অথচ চটপটে শরীরটা নিয়ে সটাং ঝাঁপিয়ে পড়ে টুপিটা তুলে এনে হেমবাবুর হাতে দিলো। কখন যে তার ক্লান্ত সাইকেলের চাকা
ঘুরে ঘুরে থেমে গিয়েছে তা তিনি খেয়ালই করেননি। হেডলাইটটাও কেমন যেন তখন ম্লান নিভু নিভু দেখাচ্ছে।
“একি কান্ড হেমবাবু! আপনার তো একটা বড় রকম এক্সিডেন্টে হতে পারতো। এই ভাবে সাইকেল এক দিকে
উল্টো ভাবে খাড়া হয়ে পড়ে রয়েছে? বেশি মাত্রায় চোট জখম হলে ওষুধ দিতে হবে বৈকি। কি হয়রানি বলুন দিকি! চলুন আপনাকেও একবার ভালো করে চেক করে নেবো,” হাতের মেডিকেল বাক্সটি দেখিয়ে ডাক্তার বললেন।
একটি পাথরের চাঁইযে তার সাইকেলটির সামনের চাকা গেঁথে গিয়েছিল। কুলিদের সাহায্যে সেটিকে কোনপ্রকারে ছাড়িয়ে নিয়ে আবার সাইকেলটাকে সোজা করে দাড় করিয়ে বাকিটা রাস্তা হেমবাবু যেতে যেতে সেই সন্ধের অপ্রত্যাশিত ঘটনার বিবরণী দিতে লাগলেন। কয়েক যুগ ধরে এবং বংশ পরম্পরায় চলে আসা সেই ঐতিহাসিক ও আকস্মিক ঘটনার বর্ণনা আজ যেন কোন কিংবদন্তি গল্পের চেয়ে কম নয়। হেমেন্দ্রচন্দ্র দত্তের বাঘদর্শন সেদিন হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তার চেয়েও অকল্পনীয় হলো তার দুচাকার জঙ্গলযান — যার অদ্ভুতুড়ে চক্রব্যূহ তাকে সেদিন একটি চিতা বাঘের মারণ থাবা থেকে জন্মের মতো বাঁচিয়েছিল। তাকে পুনর্জীবন প্রদান করেছিল।
**********************************************************************






Comments
Post a Comment